চন্ডীপাঠ : ছন্দ ও লয়ের সঙ্গে শক্তি সাধনার এক মহা‌গাথা

চন্ডীপাঠের সংজ্ঞা

চণ্ডীপাঠ হলো মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর অংশ ‘দেবী মহাত্ম্যম’ বা ‘দুর্গাসপ্তশতী’-এর শ্লোকসমূহ পাঠ করার ধর্মীয় প্রক্রিয়া। এতে মোট ১৩টি অধ্যায়ে ৭০০টি শ্লোক রয়েছে, যেখানে দেবী দুর্গার শক্তি, বীরত্ব ও অসুর বিনাশের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। ‘চণ্ডী’ শব্দটি দেবী দুর্গার এক রূপকে বোঝায়, যিনি চণ্ড-মুণ্ডসহ নানা অসুরকে বধ করেন। এই পাঠ প্রধানত শারদীয়া দুর্গাপুজো, বসন্তী পূজা বা বিশেষ শুভক্ষণে করা হয়।

ক 

কে চন্ডীপাঠ করেন ?

সাধারণত চণ্ডীপাঠ করেন পুরোহিত বা ব্রাহ্মণ যারা সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণে পারদর্শী। তবে ভক্তি ও সঠিক উচ্চারণে দক্ষ বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র মহাশয় চন্ডীপাঠ করেছিলেন। বিশেষ করে দুর্গাপুজোর সময় অভিজ্ঞ পুরোহিতরা মন্ত্রসহ আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। অনেক ভক্ত নিজের বাড়িতেও দেবীকে উদ্দেশ্য করে চণ্ডীপাঠ করেন, যা আধ্যাত্মিক শক্তি ও মানসিক শান্তি প্রদান করে।

চন্ডীপাঠের ইতিহাস

চণ্ডীপাঠ হলো মার্কণ্ডেয় পুরাণ থেকে নেওয়া একটি মহাশক্তির স্তোত্র, যা বিশেষভাবে দেবী মহাত্ম্যম বা দুর্গাসপ্তশতী নামে পরিচিত। এর মূল শ্লোক সংখ্যা ৭০০, তাই একে সপ্তশতীও বলা হয়। ধারণা করা হয়, প্রায় ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যে এই পাঠ রচিত হয়। এই পাঠে দেবী দুর্গার বিভিন্ন রূপ—যেমন মা কালী, মা জগদ্ধাত্রী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতী—এর বীরত্ব, করুণা ও শক্তির বর্ণনা রয়েছে।

ভারতীয় সংস্কৃতিতে চণ্ডীপাঠের বিশেষ স্থান আছে। দুর্গাপুজো, অকাল বোধন, নবরাত্রি ও অন্যান্য শাক্ত উৎসবে এই পাঠ অত্যন্ত শুভ ও আবশ্যক অংশ। পুরাণ মতে, চণ্ডীপাঠ শোনা বা পাঠ করার মাধ্যমে জীবনের অশুভ শক্তি দূর হয়, মনোবল বৃদ্ধি পায় এবং আধ্যাত্মিক শান্তি লাভ হয়। বাঙালি সংস্কৃতিতে বিশেষত দুর্গাপূজোর সময় এটি একটি অবিচ্ছেদ্য আচার, যেখানে ভোরবেলায় কাঁসার ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি ও চণ্ডীপাঠের মন্ত্রে গোটা পরিবেশ আধ্যাত্মিক হয়ে ওঠে।

শ্রোতার অনুভূতি (Feeling after listening)

চণ্ডীপাঠ শোনার সময় এবং পরে শ্রোতারা সাধারণত যে অনুভূতিগুলো পান:

  1. আধ্যাত্মিক শান্তি – মন্ত্রের ধ্বনি ও ছন্দ মনের মধ্যে গভীর প্রশান্তি আনে।
  2. শক্তি ও সাহসের অনুভূতি – দেবীর বীরত্বগাথা শুনে মনে হয় নিজের জীবনের বাধা দূর করার সাহস পাওয়া যাচ্ছে।
  3. ভক্তিভাব ও কৃতজ্ঞতা – দেবীর কৃপা ও রক্ষাকবচের প্রতি কৃতজ্ঞতা জন্মায়।
  4. আবেগপ্রবণতা – বিশেষত যখন পাঠ সুরেলা কণ্ঠে, ঢাক-ঢোল ও শঙ্খের সঙ্গে হয়, তখন মনে আবেগের ঢেউ ওঠে।

Effect (বাহ্যিক প্রভাব)

  • সাংস্কৃতিক প্রভাব – বাঙালি সমাজে এটি ধর্মীয় ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভক্তি ও শাক্ত সংস্কৃতি প্রচার করে।
  • সমাজে ঐক্যবদ্ধতা – চণ্ডীপাঠ চলাকালীন সবাই একত্র হয়, যা সামাজিক সংহতি বাড়ায়।
  • উৎসবের আবহ সৃষ্টি – শব্দ, সুর ও মন্ত্রের মাধুর্য পরিবেশকে পবিত্র ও উজ্জ্বল করে তোলে।
  • ধর্মীয় চর্চা বৃদ্ধি – মানুষকে নিয়মিত পূজা-পাঠ ও আধ্যাত্মিক জীবনের দিকে আকৃষ্ট করে।

Affect (অন্তর্দেশীয় প্রভাব)

  • মনোবল বৃদ্ধি – দেবীর শক্তির কাহিনি মনে আত্মবিশ্বাস জাগায়।
  • ভয় দূরীকরণ – পাঠের সময়কার কম্পন ও ছন্দ এক ধরনের মানসিক সাহস যোগায়, যা দুশ্চিন্তা ও ভয়কে কমায়।
  • ধ্যান ও মনঃসংযোগ বৃদ্ধি – মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনি মস্তিষ্কে থেটা ও আলফা ওয়েভ তৈরি করে, যা গভীর মনোসংযোগ ও প্রশান্তি আনে।
  • আবেগের পরিশুদ্ধি – দীর্ঘদিনের চাপ, দুঃখ বা রাগ A লাঘব হয়, মনে হালকা লাগে ।

চন্ডীপাঠ অনুসারে মা দুর্গার কাহিনী 

চণ্ডীপাঠের কাহিনী অনুসারে, মহিষাসুর নামে এক অসুর দেবতাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করে অত্যাচার চালাতে থাকে। তখন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরসহ দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। দেবী সিংহে আরোহণ করে দশ হাতে নানা অস্ত্র ধারণ করে মহিষাসুর ও অন্যান্য অসুরদের সঙ্গে তীব্র যুদ্ধ করেন। অবশেষে তিনি মহিষাসুরকে বধ করে ধর্ম, ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এই কাহিনী শক্তি, সাহস ও ন্যায়ের জয়ের প্রতীক।

চন্ডীপাঠ অনুসারে মা জগদ্ধাত্রীর কাহিনী 

চণ্ডীপাঠের কাহিনী অনুসারে, মা জগদ্ধাত্রী দেবী দুর্গারই এক রূপ, যিনি অজ্ঞান, অহংকার ও ভয়ের প্রতীক অসুরদের বধ করে জগতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। কিংবদন্তি মতে, দেবরাজ ইন্দ্র অহংকারে আচ্ছন্ন হলে দেবী তাঁকে শিক্ষা দিতে আবির্ভূত হন। তিনি সিংহবাহিনী, হাতে ধনুক-বাণ ও শঙ্খ-চক্র ধারণ করে অসুরদের বিনাশ করেন। মা জগদ্ধাত্রী জ্ঞান, সংযম ও ন্যায়ের প্রতীক, এবং তাঁর পূজা মূলত কার্তিক মাসে আনন্দ ও ভক্তিভরে পালন করা হয়।

চন্ডীপাঠ অনুসারে মা কালীর কাহিনী 

চণ্ডীপাঠের কাহিনী অনুসারে, মা কালী দেবী দুর্গার এক ভয়ংকর রূপ, যিনি অসুর বিনাশে আবির্ভূত হন। শুম্ভ-নিশুম্ভ ও চণ্ড-মুণ্ডসহ বহু অসুরের অত্যাচারে দেবতারা বিপর্যস্ত হলে, দেবী ভয়ংকর কালো রূপ ধারণ করেন। তিনি রণক্ষেত্রে প্রবল শক্তিতে অসুরদের ধ্বংস করেন এবং মাথা নিয়ে নৃত্য করেন। মা কালী শক্তি, ভয়মুক্তি ও অধর্ম বিনাশের প্রতীক, যিনি দুষ্টের দমন ও সৎ শক্তির প্রতিষ্ঠা করেন।


চণ্ডীপাঠ শক্তি, সাহস ও দুষ্টের বিনাশের প্রতীক। এটি শোনার সময় শ্রোতার মনে ভক্তি, আস্থা ও সাহস জন্মায়। মন্ত্রের ছন্দ ও সুর মনকে শান্ত করে, নেতিবাচক চিন্তা দূর করে এবং একধরনের আধ্যাত্মিক শক্তি অনুভব করায়। অনেকে বিশ্বাস করেন, চণ্ডীপাঠে দেবীর আশীর্বাদ লাভ হয় ও জীবনের বাধা কাটে।

সংক্ষেপে, চণ্ডীপাঠ শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণের অংশ। এর ইতিহাস প্রাচীন, কিন্তু প্রভাব আজও সমান শক্তিশালী। শোনার পর এটি যেমন শ্রোতাদের বাহ্যিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করে, তেমনি অন্তর্দেশীয়ভাবে শক্তি, শান্তি ও সাহস জোগায়। তাই দুর্গাপূজা বা যেকোনো শাক্ত উৎসবে চণ্ডীপাঠ একটি অপরিহার্য আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস।



















Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

সুরে বাঁধা ভালোবাসার গল্প

সুরের মিষ্টি নীরবতা